মায়ের বুকের দুধ কম হওয়ার কারণ ও বৃদ্ধির উপায়
মায়ের বুকের দুধ কম হওয়ার কারণ ও বৃদ্ধির উপায়
অনেক মা সন্তান জন্মের পর মনে করেন তাদের বুকের দুধ কম হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি একটি ভুল ধারণা। শিশু বারবার কাঁদলে, ঘন ঘন দুধ খেতে চাইলে বা স্তন নরম অনুভব হলে অনেক মা ভাবেন দুধ যথেষ্ট হচ্ছে না, যদিও শিশুটি স্বাভাবিক পরিমাণেই দুধ পাচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই বুকের দুধ কম হতে পারে, যার কারণ হতে পারে শিশুকে সঠিকভাবে স্তন্যপান না করানো, পর্যাপ্ত দুধ না খাওয়ানো, মায়ের কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ। সুখবর হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানো, সঠিকভাবে স্তন্যপান নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার মাধ্যমে দুধের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। তাই দুধ কম হচ্ছে মনে হলে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক কারণ খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুধ কম হওয়ার কারণগুলো
শরীরের ভেতরের সমস্যা (হরমোন বা গঠনগত)
- থাইরয়েডের সমস্যা থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করলে দুধ তৈরির হরমোন "প্রোল্যাকটিন"-এর কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক মা-ই জানেন না যে তাদের থাইরয়েডের সমস্যা আছে। তাই দুধ কম হলে থাইরয়েড পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো ।
- PCOS (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম) এই সমস্যা থাকলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং স্তনের দুধ তৈরির টিস্যু পুরোপুরি বিকশিত হয় না — ফলে দুধ কম হতে পারে ।
- ডায়াবেটিস রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে প্রসবের পর দুধ আসতে দেরি হয়। সিজারিয়ান ডেলিভারির ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি দেখা যায় ।
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ (শীহান'স সিনড্রোম) প্রসবের সময় অনেক বেশি রক্ত গেলে পিটুইটারি গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে — যেটা দুধ তৈরির হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। এই কারণে দুধ উৎপাদন স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে।
- স্তনের অপারেশন আগে কখনো স্তনে অপারেশন হয়ে থাকলে দুধের নালী বা স্নায়ু কাটা পড়তে পারে, যা দুধ উৎপাদনে সমস্যা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন ছোট করার অপারেশন হয়েছে এমন মায়েদের ৬৫-৭৫% দুধ উৎপাদনে কমবেশি সমস্যায় পড়েন ।
যেভাবে দুধ খাওয়ালে সমস্যা হয়
এটা আসলে সবচেয়ে বড় কারণ। এবং এটা সবচেয়ে সহজে ঠিক করা যায়।
- কম ঘন ঘন খাওয়ানো বুকের দুধ কাজ করে চাহিদা-যোগান নীতিতে। শিশু যত বেশি চুষবে, তত বেশি দুধ তৈরি হবে। দিনে মাত্র ৪-৫ বার খাওয়ালে স্তন বোঝে — "এতটুকুই দরকার" — এবং সেই অনুযায়ী কম দুধ তৈরি করে ।
- ভুলভাবে বুকে ধরা (ভুল ল্যাচিং) শিশু ঠিকমতো স্তন মুখে না নিলে দুধ টেনে বের করতে পারে না। ফলে স্তন পর্যাপ্ত উদ্দীপনা পায় না এবং দুধ কমে যায়। আর মায়ের নিপলেও ব্যথা হয়, যার কারণে মা কম কম খাওয়াতে চান।
- প্রথম দিন থেকেই ফর্মুলা বা পানি দেওয়া শিশুকে বোতলের দুধ দিলে সে কম ক্ষুধা অনুভব করে, ফলে কম চুষে — আর দুধও কমে যায়। এভাবে একটা দুষ্টচক্র তৈরি হয়।
- জন্মের পরে দেরিতে শুরু করা জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে বুকে দেওয়াটা খুবই জরুরি। এই সময়টাকে "গোল্ডেন আওয়ার" বলা হয়। অনেক হাসপাতালে সিজারের পর শিশুকে সাথে সাথে মায়ের কাছে দেওয়া হয় না — এটা দুধ আসার প্রক্রিয়াকে দেরি করিয়ে দেয়।
মানসিক অবস্থা ও চাপ
এটা অনেকেই বুঝতে পারেন না, কিন্তু মনের অবস্থা বুকের দুধে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
- মানসিক চাপ ও ভয় মানসিক চাপে শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়ে। এই হরমোন "অক্সিটোসিন"-এর কাজে বাধা দেয় — আর অক্সিটোসিনই হলো দুধ বের হওয়ার চাবিকাঠি। মা যদি উদ্বিগ্ন থাকেন, দুধ সহজে আসে না ।
- প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা অনেক মা প্রসবের পর বিষণ্নতায় ভোগেন — এটা লুকানোর বিষয় না, এটা একটা শারীরিক সমস্যা। এই অবস্থায় মা খাওয়াতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, ফলে দুধও কমে ।
- ঘুমের অভাব রাতে বুকের দুধ তৈরির হরমোন সবচেয়ে বেশি থাকে। রাতের ফিডিং বাদ দিলে এই সুযোগ নষ্ট হয়।
ওষুধ বা অভ্যাসের কারণে
- ইস্ট্রোজেনযুক্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি দুধ উৎপাদন কমিয়ে দেয়
- ঠান্ডার কিছু ওষুধে থাকা সিউডোএফেড্রিন দুধের পরিমাণ কমায়
- ধূমপান প্রোল্যাকটিনের কাজ কমিয়ে দেয় — ধূমপায়ী মায়েদের দুধ গড়ে ২৫-৩০% কম হতে পারে
শিশুর নিজের সমস্যা
কখনো সমস্যাটা মায়ের নয়, শিশুর।
- জিভ-বন্ধন (Tongue-Tie): শিশুর জিভের নিচের চামড়া খুব টাইট হলে সে ঠিকমতো চুষতে পারে না
- অকাল জন্ম: সময়ের আগে জন্মানো শিশুর চোষার শক্তি কম থাকে
- জন্ডিস বা অসুস্থতা: শিশু অসুস্থ থাকলে ঠিকমতো খেতে পারে না
দুধ বাড়ানোর উপায়
বেশি বেশি খাওয়ান — এটাই সবচেয়ে বড় ওষুধ
দিনে অন্তত ৮ থেকে ১২ বার শিশুকে বুকের দুধ দিন — রাতেও। শিশু চাইলেই দিন, ঘড়ি দেখবেন না। স্তন যত বেশি খালি হবে, তত বেশি দুধ তৈরি হবে। এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
সঠিকভাবে বুকে ধরান
সঠিক ল্যাচিং মানে — শিশু শুধু নিপল নয়, নিপলের চারপাশের কালো অংশ (অ্যারিওলা)-সহ মুখে নেবে। শিশুর ঠোঁট বাইরের দিকে উল্টানো থাকবে, মায়ের নিপলে ব্যথা থাকবে না। যদি ব্যথা হয়, সেটা ঠিকমতো ধরা হয়নি।
প্রথমবার হলে কোনো অভিজ্ঞ নার্স বা ল্যাকটেশন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে শিখে নেওয়াই ভালো।
গায়ে গা লাগিয়ে রাখুন (Skin-to-Skin)
শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরুন — কাপড় সরিয়ে, সরাসরি ত্বকে ত্বক। এতে অক্সিটোসিন হরমোন বাড়ে, দুধ বের হওয়া সহজ হয় এবং শিশু বেশি চুষতে চায় । বিশেষ করে অকাল জন্মানো শিশুর মায়েদের জন্য এটা খুবই উপকারী।
পাওয়ার পাম্পিং — স্তন পাম্প ব্যবহার করে দ্রুত দুধ বাড়ানো
প্রতিদিন একবার নিচের নিয়মে পাম্প করুন:
- ২০ মিনিট পাম্প → ১০ মিনিট বিশ্রাম → ১০ মিনিট পাম্প → ১০ মিনিট বিশ্রাম → ১০ মিনিট পাম্প
এক থেকে দুই সপ্তাহ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় ।
পর্যাপ্ত পানি খান
দুধ মানেই তরল। শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে দুধও কম হবে। প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি বা তরল পান করুন। খাওয়ানোর সময় পাশে এক গ্লাস পানি রাখুন — খিদে পেলে শরীর নিজেই মনে করিয়ে দেবে।
ভালো খাবার খান
বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের শরীরের অতিরিক্ত ৩০০-৫০০ ক্যালোরি দরকার হয় । এর মানে না যে প্রচুর ঘি-চর্বি খেতে হবে — বরং দরকার সুষম খাবার।
রোজকার খাবারের তালিকায় রাখুন:
- শাকসবজি ও ফলমূল
- ডিম, মাছ বা মাংস
- ডাল ও শিমের বীজ
- ভাত বা রুটি
দুধ বাড়ানোর কিছু খাবার
এগুলোকে বলা হয় "গ্যালাক্টাগোগ" — যেসব খাবার বা ভেষজ দুধ বাড়াতে সাহায্য করে বলে প্রমাণ আছে।
| খাবার | কীভাবে কাজ করে |
|---|---|
| মেথি | ফাইটোএস্ট্রোজেন থাকে |
| সজিনা পাতা (মরিঙ্গা) | আয়রন ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ |
| আদা | রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় |
| ওটস | আয়রন ও বেটা-গ্লুকান আছে |
| কাঁচা পেঁপে | পেপেইন এনজাইম আছে |
| রসুন | দুধের গন্ধ পরিবর্তন করে |
| তিল | ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ |
মনে রাখবেন: এই খাবারগুলো সহায়ক, কিন্তু বেশি বেশি খাওয়ানোর বিকল্প নয়। শুধু মেথি খেলেই দুধ বাড়বে না — যদি না সঠিকভাবে খাওয়ানো হয়।
আমাদের দেশে যে ভুল ধারণাগুলো ছড়িয়ে আছে
❌ "প্রথম দুধ (কোলোস্ট্রাম) ফেলে দিতে হয়"
এটা সম্পূর্ণ ভুল। প্রথম হলুদ দুধটাকে বিশেষজ্ঞরা বলেন "তরল সোনা"। এতে এত বেশি অ্যান্টিবডি আছে যে এটা শিশুর জন্য প্রথম টিকার মতো কাজ করে। এটা কখনো ফেলবেন না।
❌ "গরু বা ছাগলের দুধ বুকের দুধের বিকল্প"
ছয় মাসের কম বয়সী শিশুকে কখনো গরু বা ছাগলের দুধ দেবেন না। এতে শিশুর কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
❌ "বুকের দুধ পানির মতো পাতলা — তাই কম পুষ্টিকর"
একদম ভুল। বুকের দুধ শিশুর বয়স ও চাহিদা অনুযায়ী নিজেই বদলায়। শেষের দিকের দুধে (Hindmilk) অনেক বেশি চর্বি থাকে।
❌ "মিষ্টি বা চর্বিজাতীয় খাবার খেলে দুধ বাড়ে"
দুধ বাড়ে খাওয়ানোর পরিমাণ বাড়লে, নির্দিষ্ট কোনো খাবার খেলে নয়। বরং পুষ্টিকর ও সুষম খাবারই দরকার।
❌ "রাতে খাওয়ালে মায়ের শরীর খারাপ হয়"
রাতের ফিডিং বরং দুধ উৎপাদনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ে প্রোল্যাকটিনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
এই লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
- শিশু জন্মের প্রথম সপ্তাহে জন্মের ওজনের ১০%-এর বেশি কমে গেছে
- দুই সপ্তাহেও জন্মের ওজনে ফেরেনি
- শিশু দিনে ৬টির কম ভেজা ডায়াপার ব্যবহার করছে
- শিশু অস্বাভাবিক ঘুমন্ত বা দুর্বল
- স্তনে ব্যথা, লাল হওয়া, পিণ্ড বা জ্বর (ম্যাস্টাইটিসের লক্ষণ হতে পারে)
- মা নিজে অনেক বেশি বিষণ্ন বা অস্থির বোধ করছেন