কর্মজীবী ও ব্যস্ত মায়েদের জন্য বুকের দুধ সংরক্ষণ ও শিশুকে খাওয়ানোর খাওয়ানোর নিয়ম
কর্মজীবী ও ব্যস্ত মায়েদের জন্য বুকের দুধ সংরক্ষণ ও শিশুকে খাওয়ানোর সহজ গাইড
একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই । চিকিৎসকদের মতে, শিশুর জীবনের প্রথম ৬ মাস তাকে শুধু বুকের দুধই খাওয়ানো উচিত । তবে বর্তমান সময়ে চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা বা অসুস্থতার কারণে অনেক সময় মাকে শিশুর কাছ থেকে দূরে থাকতে হয় । এমন পরিস্থিতিতে বুকের দুধ চিপে বা পাম্প করে জমিয়ে রাখা একটি দারুণ সমাধান।
সঠিক নিয়মে দুধ সংরক্ষণ করলে এর পুষ্টিগুণ বজায় থাকে এবং শিশু মায়ের অনুপস্থিতিতেও সম্পূর্ণ পুষ্টি পায় । তবে সামান্য অসাবধানতায় দুধে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে । তাই দুধ সংরক্ষণ ও খাওয়ানোর নিরাপদ ও সহজ উপায়গুলো নিচে ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো।
দুধে যাতে কোনো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু ছড়াতে না পারে, সেজন্য কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে :
- হাত ধুয়ে নিন: দুধ বের করার আগে অবশ্যই হাত সাবান ও কুসুম গরম পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ভালো করে ধুয়ে নিন ।
- জায়গাটি পরিষ্কার রাখুন: আপনি যে টেবিলে বা কাউন্টারে বোতল বা পাম্পের যন্ত্রাংশ রাখবেন, সেটি আগে পরিষ্কার কাপড় বা জীবাণুনাশক ওয়াইপস দিয়ে মুছে নিন ।
- স্তনের যত্ন: দুধ বের করার আগে মায়ের স্তন বা বোঁটা সাবান দিয়ে ধোয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, সাধারণ পরিষ্কার থাকলেই চলবে ।
মায়ের দুধ সাধারণত দুইভাবে বের করা যায়—হাত দিয়ে চেপে অথবা ব্রেস্ট পাম্প ব্যবহার করে ।
- হাত দিয়ে বের করার নিয়ম (Hand Expression):
- আরামদায়কভাবে বসুন এবং দুধ সংগ্রহের পাত্রটি স্তনের কাছে ধরুন ।
- স্তনের বোঁটার চারপাশের কালো অংশের (Areola) কিছুটা বাইরে বুড়ো আঙুল উপরে এবং তর্জনী নিচে রেখে একটি 'C' আকৃতি তৈরি করুন ।
- এবার স্তনটি ভেতরের দিকে (বুকের পাঁজরের দিকে) আলতো চাপ দিন । এরপর মৃদু ছন্দে আঙুল দুটি চেপে ধরুন এবং ছেড়ে দিন ।
- সরাসরি স্তনের বোঁটাতে চাপ দেবেন না, এতে ব্যথা লাগতে পারে এবং দুধ বের হবে না ।
- প্রথম কয়েকদিন যে ঘন চটচটে শালদুধ (Colostrum) নিঃসৃত হয়, তা অল্প পরিমাণে বের হয় বলে সরাসরি একটি পরিষ্কার চামচ বা প্লাস্টিকের সিরিঞ্জ দিয়ে সংগ্রহ করা সবচেয়ে সুবিধাজনক ।
- ব্রেস্ট পাম্পের ব্যবহার:
- আপনি চাইলে ভালো মানের ম্যানুয়াল বা ইলেকট্রিক ব্রেস্ট পাম্প ব্যবহার করতে পারেন। পাম্পের ফানেলটি স্তনের সাথে ভালোভাবে ফিট হওয়া জরুরি।
- পাম্প ধোয়ার নিয়ম: প্রতিবার ব্যবহারের পর পাম্পের দুধের সংস্পর্শে আসা অংশগুলো খুলে আলাদা করুন । প্রথমে ঠান্ডা বা হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিন । সরাসরি সিঙ্কের ভেতর অংশগুলো রাখবেন না, কারণ সিঙ্কের জীবাণু পাম্পে লেগে যেতে পারে । আলাদা একটি পরিষ্কার গামলা বা বেসিনে গরম পানি ও বাসন ধোয়ার তরল সাবান দিয়ে ব্রাশ দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করুন । এরপর পরিষ্কার তোয়ালে বা পেপার টাওয়েলের ওপর রেখে বাতাসে শুকাতে দিন ।
- জীবাণুমুক্তকরণ: শিশুর বয়স ৩ মাসের কম হলে বা শিশু দুর্বল হলে দিনে অন্তত একবার পাম্পের অংশগুলো ফুটন্ত পানিতে ৫ মিনিট ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত (Sanitize) করে নেওয়া উচিত ।
বুকের দুধ সংরক্ষণের জন্য সঠিক পাত্র নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ :
- নিরাপদ পাত্র: দুধ রাখার জন্য বিপিএ-মুক্ত (BPA-free) শক্ত প্লাস্টিকের বোতল, কাচের বোতল অথবা বুকের দুধ রাখার জন্য তৈরি বিশেষ স্টোরেজ ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে।
- যা ব্যবহার করবেন না: প্রস্রাব বা অন্য পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত সাধারণ মেডিকেল পাত্রে কখনো দুধ রাখবেন না, কারণ এগুলো খাদ্য সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ নয় । সাধারণ পাতলা পলিথিন ব্যাগও ব্যবহার করা যাবে না, কারণ এগুলো সহজে ফেটে যেতে পারে ।
- ফাঁকা জায়গা রাখুন: ফ্রিজে রাখলে জমে বরফ হওয়ার পর দুধের আয়তন বাড়ে। তাই পাত্রটি একদম মুখ পর্যন্ত ভর্তি না করে ওপরের দিকে অন্তত ১ ইঞ্চি খালি রাখুন ।
- লেবেল করুন: দুধের পাত্রের গায়ে মাস্কিং টেপ লাগিয়ে পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে দুধ বের করার তারিখ ও সময় লিখে রাখুন, যাতে পুরোনো দুধ আগে খাওয়ানো যায়।
সংরক্ষণের তাপমাত্রা এবং সময়ের একটি সহজ হিসাব নিচে দেওয়া হলো, যা সাধারণ সুস্থ শিশুদের জন্য প্রযোজ্য :
| সংরক্ষণের স্থান | তাপমাত্রা | কতক্ষণ ভালো থাকবে? | গুরুত্বপূর্ণ টিপস |
|---|---|---|---|
| ঘরের সাধারণ টেবিলে | ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম | ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত | পরিষ্কার পরিবেশে রাখলে সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত রাখা সম্ভব । |
| নরমাল ফ্রিজে | ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি | ৪ দিন পর্যন্ত | খুব পরিষ্কার অবস্থায় রাখলে ৫ থেকে ৮ দিনও ভালো থাকে । সবসময় ফ্রিজের দরজায় না রেখে একদম ভেতরের দিকে রাখুন। |
| নরমাল ফ্রিজের ভেতরের ছোট বরফ চেম্বারে | -১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস | ২ সপ্তাহ | এটি কেবল আলাদা দরজা না থাকা ফ্রিজের বরফ চেম্বারের জন্য প্রযোজ্য । |
| আলাদা দরজাবিশিষ্ট ফ্রিজারে | -১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা কম | ৩ থেকে ৬ মাস | গুণগত মান বজায় রেখে সর্বোচ্চ ৯ মাস পর্যন্ত রাখা নিরাপদ । |
| আলাদা ডিপ ফ্রিজে | -২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে | ৬ থেকে ১২ মাস | দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য এটি সবচেয়ে ভালো । |
| ভ্রমণের সময় কুলার ব্যাগে | বরফ বা আইস প্যাকসহ | ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত | দূরে কোথাও যাতায়াত বা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় এটি কার্যকর । |
ফ্রিজ থেকে বের করে দুধ সরাসরি শিশুকে খাওয়ানো যাবে না, আবার তা ভুল উপায়ে গরমও করা যাবে না ।
- ধীরে ধীরে গলানো (Thawing): সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, ফ্রিজারের শক্ত হয়ে থাকা দুধের পাত্রটি খাওয়ানোর আগের দিন রাতে নরমাল ফ্রিজে নামিয়ে রাখা । এতে প্রায় ১২ ঘণ্টায় দুধটি স্বাভাবিক তরল হয়ে যাবে ।
- তাড়াতাড়ি গলানো: যদি দ্রুত গলাতে হয়, তবে পাত্রটি একটি গামলা কুসুম গরম পানির মধ্যে বসিয়ে রাখুন অথবা প্রবহমান কুসুম গরম পানির ধারার নিচে ধরুন ।
- সাবধান! কখনোই ওভেন বা সরাসরি চুলায় গরম করবেন না: ওভেনে বা সরাসরি আগুনে দুধ গরম করলে দুধের রোগপ্রতিরোধকারী উপাদান ও ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া দুধে অতিরিক্ত গরম অংশ (Hot spot) তৈরি হতে পারে, যা শিশুর মুখ পুড়িয়ে দিতে পারে ।
- মিশিয়ে নিন ও তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন: দুধের পাত্রটি আলতো করে ঘুরিয়ে ঝাঁকিয়ে নিন (Swirl), যাতে আলাদা হয়ে যাওয়া ননি বা ফ্যাট ভালোভাবে মিশে যায় । খাওয়ানোর আগে নিজের কবজির ভেতরের অংশে কয়েক ফোঁটা ফেলে তাপমাত্রা দেখে নিন, এটি যাতে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার মতো হালকা কুসুম গরম অনুভূত হয় ।
- গলানো দুধের নিয়ম: একবার ফ্রিজের দুধ সম্পূর্ণ গলে গেলে তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খাইয়ে ফেলতে হবে এবং কোনোভাবেই তা আর পুনরায় ডিপ ফ্রিজে জমিয়ে রাখা যাবে না ।
- অবশিষ্ট দুধ ফেলে দিন: শিশু যদি বোতল বা বাটি থেকে দুধ খাওয়া শুরু করে এবং কিছুটা দুধ থেকে যায়, তবে সেই অবশিষ্ট দুধ ২ ঘণ্টার মধ্যে খাইয়ে শেষ করতে হবে । ২ ঘণ্টা পার হয়ে গেলে তা ফেলে দিতে হবে, কারণ শিশুর মুখের লালা থেকে দুধে ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে ।
অনেক মা খেয়াল করেন যে ফ্রিজে রাখার পর দুধের গন্ধ সাবানের মতো বা কিছুটা ধাতব হয়ে গেছে ।
- কেন এমন হয়? বুকের দুধে প্রাকৃতিকভাবে 'লাইপেজ' নামের একটি উপকারী এনজাইম থাকে যা চর্বি হজম করতে সাহায্য করে । ফ্রিজে বা ফ্রিজারে থাকা অবস্থাতেও এটি কাজ করে এবং চর্বি ভেঙে ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে । এর ফলে দুধের স্বাদে ও গন্ধে এই পরিবর্তন আসে ।
- এটি কি ক্ষতিকর? না, এটি শিশুর জন্য মোটেও ক্ষতিকর বা অনিরাপদ নয় । তবে কিছু শিশু এই গন্ধের কারণে দুধ খেতে চায় না।
- সমাধান: যদি আপনার শিশু এই দুধ খেতে না চায়, তবে দুধ বের করার পরপরই (ফ্রিজে রাখার আগে) হালকা একটু ফুটিয়ে তোলার মতো গরম (Scalding) করে নিন এবং সাথে সাথে ঠান্ডা করে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখুন । এতে লাইপেজ এনজাইমটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং গন্ধ তৈরি হয় না ।
- পুষ্টির তারতম্য: দীর্ঘদিন ফ্রিজে রাখলে দুধের ভিটামিন সি ও কিছু রোগপ্রতিরোধকারী উপাদান সামান্য হ্রাস পেতে পারে । তবুও মনে রাখবেন, সংরক্ষিত এই বুকের দুধ বাজার থেকে কেনা যেকোনো ফর্মুলা বা কৌটার দুধের চেয়ে শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য শতগুণ বেশি উপকারী ও নিরাপদ।
কর্মজীবী মায়েদের জন্য বুকের দুধ সংরক্ষণ করা একটি আশীর্বাদস্বরূপ। আপনি যদি ৪ দিনের মধ্যে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন, তবে দুধটি ফ্রিজারে না রেখে নরমাল ফ্রিজেই রাখুন, কারণ এতে দুধের প্রাকৃতিক গুণাগুণ সবচেয়ে ভালো অবস্থায় থাকে । একটি পরিষ্কার নিয়ম এবং সামান্য যত্ন আপনার সন্তানকে মায়ের অনুপস্থিতিতেও সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করবে।